কাহিনী মূলক ধাঁধা | Bengali Long Riddles | Bangla Dhadha
কতকগুলি ধাঁধার সুদীর্ঘ কাহিনী ব্যাপিয়া জিজ্ঞাসাটি প্রকাশ করা হয়, সাধারণ ধাঁধার মত কেবলমাত্র কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কবিতার পদের মধ্য দিয়া তাহাদিগের জিজ্ঞাসাটি উপস্থিত করা হয় না। ইহাদিগকে কাহিনীমূলক ধাঁধা বলিয়া উল্লেখ করা যায়। কালিদাসের নামে প্রচলিত ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ বৌদ্ধ জাতক এবং অন্যান্য প্রাচীন কথাসাহিত্যে ইহাদের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায়। বাংলা দেশের লৌকিক কথাসাহিত্যের উপরও ইহাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব স্থাপিত হইয়াছিল। এমন কি, এই শ্রেণীর সংস্কৃত কাহিনীগুলি বাংলায় রূপান্তরিত হইয়াও বহুল প্রচার লাভ করিয়াছিল। ক্রমে তাহাদের অনুসরণে বহু বাংলা কাহিনীও মুখে মুখে রচিত হইয়াছে।
এই সকল কাহিনীর মধ্যে যেমন একদিকে নীতি উপদেশ দেওয়া হইয়াছে তেমনই আর একদিক দিয়া হাস্যরস সৃষ্টিরও অবকাশ পাওয়া গিয়াছে। অধিকাংশ বাংলা কাহিনীরই জিজ্ঞাস্য বোকা কে? একাধিক বোকার কাণ্ড ইহাদের মধ্যে বর্ণনা করিবার পর সব চাইতে বোকা কে, তাহাই এখানে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে এবং বোকাদিগের আচার আচরণ প্রচুর হাস্যরস সৃষ্টি করিয়াছে। বাংলা ধাঁধায় যে পরিমাণ হাস্যরস পরিবেশন করা হইয়াছে, তাহার একটা বিপুল অংশ এই শ্রেণীর কাহিনীর মধ্য দিয়াই প্রকাশ পাইয়াছে।
‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’র এই শ্রেণীর কাহিনীগুলি বাংলা দেশে ব্যাপক প্রচলিত বলিয়া তাহারও কয়েকটি কাহিনী নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল। একটি জাতকের কাহিনীরও নিদর্শন দেওয়া হইল। এই সকল কাহিনী সামান্য পরিবর্তিত আকারে বাংলা দেশের আজিও সর্বত্রই প্রচলিত আছে।
কাহিনী – ১
বারাণসীর রাজা ছিলেন প্রতাপ মুকুট, বজ্রমুকুট ছিল তাঁহার হৃদয়-নন্দন রাজকুমার। একদিন রাজকুমার অমাত্যপুত্রের সঙ্গে এক অরণ্যের নিকটবর্তী স্থানে মৃগয়ায় গমন করেন। ঐ স্থানে ছিল এক মনোরম সরোবর। রাজপুত্র যখন অশ্ব হইতে অবতরণ করিলেন, তখন এক সুন্দরী রাজকন্যা সেই সরোবর তীরে স্নান সমাপন করিয়া মহাদেবের পূজা করিতেছিলেন। রাজকুমার রাজকুমারীকে দেখিয়া মোহিত হইলেন। রাজকুমারীও রাজকুমারকে দেখিয়া অলক পদ্ম হস্তে লইলেন, তাহা কর্ণ সংযুক্ত করিয়া দন্ত দ্বারা ছিন্ন করিলেন এবং পদতলে নিক্ষেপ করিলেন, আবার তাহা গ্রহণ করিয়া হৃদয়ে স্থাপন করিলেন এবং রাজকুমারের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিতে চাহিতে সঙ্গিনীদের সঙ্গে প্রস্থান করিলেন।
এইদিকে রাজকুমার বিরহ বেদনায় অত্যন্ত কাতর হইয়া উঠিলেন এবং প্রিয় বয়স্য অমাত্যপুত্র সর্বাধিকুমারকে বলিলেন—’বন্ধু, আমি এক অজ্ঞাতনামা সুন্দরীকে ভালবাসিয়াছি, প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহাকে না পাইলে প্রাণত্যাগ করিব।’ সর্বাধিকুমার প্রশ্ন করিলেন—’বন্ধু, সে কি প্রস্থান সময়ে তোমাকে কিছু বলিয়াছিল?’ —’না বয়স্য’। —’তবে সে কি কোন ইঙ্গিত করিয়াছিল?’ রাজকুমার সেই কমল-ঘটিত বৃত্তান্ত বলিলেন। সর্বাধিকারীর পুত্র বলিলেন— ‘শুন বন্ধু, পদ্মপুষ্প মস্তক হইতে কর্ণে সংলগ্ন করিয়া সে বলিতে চায়— সে কর্ণাটনিবাসিনী, দন্ত দ্বারা ছিন্ন করিয়া সে বলিয়াছে, সে দন্তবাট রাজার কন্যা। পদ্ম পদতলে নিক্ষেপ করিয়া সে এই সঙ্কেত করিতে চায় যে তাহার নাম পদ্মাবতী। আর সেই পদ্ম হৃদয়ে রাখিয়া সে বলিল, তুমিই তাহার প্রিয়তম।’
রাজপুত্র অত্যন্ত খুশী হইয়া প্রিয় বয়স্যকে লইয়া কর্ণাট নগরে গেলেন। যেখানে এক বৃদ্ধার সহায়তায় রাজকুমার রাজকুমারীর নিকট তাহার আগমন সংবাদ প্রেরণ করিলেন। রাজকুমারী বৃদ্ধাকে গলা ধাক্কা দিয়া তাড়াইয়া দিলেন। শুনিয়া রাজপুত্র অধোমুখে চিন্তা করিতে লাগিলেন। সর্বাধিকারী পুত্র বলিলেন—’বয়স্য, চিন্তার কোন কারণ নাই। এই গলহস্ত প্রতিকূল নয়, অনুকূল। সে সঙ্কেত করিতেছে অন্তঃপুরের খড়কী দিয়া রজনী যোগে যাইতে হইবে। রজনী উপস্থিত হইল। রাজকুমার অন্তঃপুরের খড়কী দিয়া প্রাসাদে উপনীত হইলেন। গান্ধর্ব বিধানে তাঁহাদের বিবাহ হইল।
কাহিনী – ২
জয়স্থল নামে এক নগর ছিল। তথায় কেশব নামে এক ব্রাহ্মণ ছিল। ব্রাহ্মণের মধুমালতী নামে এক পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল। তাহার পিতা ও ভ্রাতা মধুমালতীর বিবাহের জন্য উদগ্রীব হইয়া উঠিল। ক্রমে তিন পাত্র একত্রিত হইল, তাহাদের নাম ত্রিবিক্রম, বামন ও মধুসূদন। তিনজনেই রূপে গুণে, বিদ্যায় বয়সে সমতুল্য। ব্রাহ্মণ এখন কি করেন? এমন সময় সর্পাঘাতে মধুমালতীর মৃত্যু ঘটিল। বিষবৈদ্যেরা অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু তাহাকে বাঁচান গেল না। অবশেষে শ্মশানে তাহার দেহ দাহ করা হইল। বরেরা মধুমালতী লাভে হতাশ হইয়া বৈরাগ্যভাব সম্পন্ন হইলেন। ত্রিবিক্রম চিতা হইতে অস্থি সঞ্চয় করিয়া দেশে দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। বামন সন্ন্যাসী হইয়া তীর্থযাত্রা করিলেন। মধুসূদনও সেই শ্মশান প্রান্তে পর্ণশালা নির্ম্মাণ করিয়া রাশিকৃত দেহ ভস্ম লইয়া যোগসাধনা করিতে লাগিলেন। একদিন বামনের সঙ্গে এক ব্রাহ্মণীর সাক্ষাৎ হইল, তিনি মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র জানিতেন। মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র আয়ত্ত করিবার পর দৈবযোগে তাহার সঙ্গে অপর দুইজন বরেরও দেখা হইল। তাহারা বামনকে অস্থি ও ভস্ম প্রদান করিল। বামনের মন্ত্র প্রভাবে মধুমালতী পুনর্জীবিতা হইল। এইবার আবার তিনজনেই মধুমালতীর প্রার্থী হইল। এখন কে মধুমালতী লাভে যথার্থ অধিকারী?
কাহিনী – ৩
ধারানগরে মহাবল নামে এক রাজা ছিল। তাঁহার দূতের নাম ছিল হরিদাস। হরিদাসের এক পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল, তাহার নাম মহাদেবী। মহাদেবী একদিন পিতাকে বলিল—’পিতঃ, যাঁহার সঙ্গে আমার বিবাহ হইবে তিনি যেন সর্ব্বগুণান্বিত পুরুষ হন’। একদিন এক ব্রাহ্মণ-তনয় হরিদাসকে বলিল—’তোমার সুন্দরী কন্যার সঙ্গে আমার বিবাহ দাও’। হরিদাস তাহার কন্যার প্রার্থনার বিষয় ব্রাহ্মণ-তনয়কে জ্ঞাপন করিল। ব্রাহ্মণ-তনয় বলিল, ‘আমি বাল্যকাল অবধি নানা বিদ্যা যত্নে আয়ত্ত করিয়াছি। এমন কি, এক আশ্চর্য রথ আমি নির্ম্মাণ করিয়াছি, যাহাতে আরোহণ করিলে এক দণ্ডে বর্ষগম্য স্থানে উপনীত হওয়া যায়’। হরিদাস বলিল, ‘আগামী কল্য আমার বাড়ীতে তোমার রথ লইয়া আসিও। তোমাকে কন্যা দান করিব’। এই দিকে হরিদাসের স্ত্রী, পুত্রও পৃথক্ পৃথক্ ব্রাহ্মণ-তনয়কে মহাদেবীর সঙ্গে বিবাহ দিবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু দৈবদুর্যোগে সেই রাত্রিতেই বিন্ধ্যাচলবাসী এক রাক্ষস মহাদেবীকে লইয়া প্রস্থান করিল; পরদিন প্রাতঃকালে মহাদেবীর অদর্শনে গৃহে কান্নার রোল উঠিল। বিবাহার্থী যুবকদের মধ্যে একজন হরিদাসকে বলিল— ‘আমি ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান প্রত্যক্ষ দেখিতে পাই। বর্তমানে আপনার কন্যাকে এক রাক্ষস হরণ করিয়া বিন্ধ্যপর্বতে লইয়া গিয়াছে।’ দ্বিতীয় বর বলিল, ‘আমি শব্দভেদী শর দ্বারা শত্রুর প্রাণ সংহার করিতে পারি, যদি কেহ আমাকে বিন্ধা পর্বতে পৌঁছাইয়া দিতে পারে।’ তৃতীয় বর বলিল— ‘এই আমার রথ, ইহাতে আরোহণ করিয়া তথায় গমন কর।’ দ্বিতীয় জন রথারোহণে বিন্ধ্যপর্বতে গমন করিল এবং রাক্ষসের প্রাণ সংহার করিয়া মহাদেবী সমভিব্যাহারে ধারা নগরে প্রত্যাবর্তন করিল। এইবার তিন বর বিবাদ করিতে লাগিল। প্রত্যেকেরই দাবী সেই মহাদেবীর পাণিগ্রহণের অধিকারী। কে মহাদেবীর পাণিগ্রহণের যথার্থ অধিকারী?
কাহিনী – ৪
ধর্মপুর নগরে ধর্মশীল নামে এক রাজা ছিলেন। রাজা অতি সুশীল, সংসার ধনে জনে পরিপূর্ণ, কিন্তু মনে তাঁহার শান্তি নাই। কারণ, রাজা অপুত্রক। একদিন রাজা মন্ত্রীর পরামর্শে দেবী কাত্যায়নীর পূজা করিয়া পুত্রবর লাভ করিলেন। সেই দেশে দীনদাস নামে এক তন্তুবায় ছিলেন। দীনদাস এক পরমাসুন্দরী কন্যার রূপলাবণ্যে মুগ্ধ ছিলেন। তিনিও একদিন কাত্যায়নী মন্দিরে গিয়া দেবীর নিকট প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হইলেন, ‘যদি আমি এই সুন্দরী রমণীকে লাভ করি, তবে স্বহস্তে নিজ মস্তক ছেদন করিয়া তোমার পূজা দিব।’ কিছুদিন বাদে দীনদাসের সঙ্গে সেই রূপলাবণ্যবতী নারীর বিবাহ হইল। দীনদাস প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া অভিলষিত দারসমাগম দ্বারা সুখে দিন যাপন করিতে লাগিলেন। একদিন দীনদাস তাহার মনোরমা পত্নী ও প্রিয় বয়স্যের সঙ্গে শ্বশুরালয়ে যাইতেছেন, পথে সেই কাত্যায়নী মন্দির দর্শন করিয়া তাহার পূর্ব স্মৃতি জাগ্রত হইল। সে বন্ধু ও পত্নীকে পথে অপেক্ষা করিতে বলিয়া মন্দিরে প্রবেশ করিল এবং স্বহস্তে দেবীর খড়গ দ্বারা মস্তক ছেদন করিল। দীনদাসের প্রত্যাবর্তনে বিলম্ব দেখিয়া তাহার বন্ধু মন্দিরে প্রবেশ করিল এবং ভাবিল সংসারের লোক মনে করিবে আমিই ইহার স্ত্রীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া ইহাকে বধ করিয়াছি। এইরূপ লোকাপবাদ অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়। সুতরাং আমার প্রাণত্যাগ করাই বিধেয়।” সেও খড়গ দ্বারা নিজের মস্তক দেহচ্যুত করিল। এদিকে তন্তুবায় কন্যা বহুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া মন্দিরে প্রবেশ করিল এবং চিন্তা করিল—বৈধব্য যন্ত্রণা ভোগ করা অপেক্ষা মৃত্যুই ভাল। তাছাড়া লোকেও বলিবে আমিই আমার স্বামী ও স্বামীর বন্ধুর প্রাণ বধ করিয়াছি। সুতরাং আমার প্রাণত্যাগ করাই বিধেয়। সেও সেই শোণিত-রঞ্জিত খড়গ দ্বারা আত্মহত্যায় নিযুক্ত হইল। ঠিক সেই সময়ে স্বয়ং দেবী আবির্ভূতা হইলেন এবং বলিলেন—”আমি তোমার সাহস দেখিয়া প্রসন্ন হইয়াছি। বর প্রার্থনা কর।” তন্তুবায় কন্যা বলিল—”জননি! যদি তুমি সন্তুষ্ট হইয়া থাক, তবে ইহাদের প্রাণ দান কর।” দেবী বলিলেন—”তুমি দেহে মস্তক সংযুক্ত করিলেই ইহারা বাঁচিয়া উঠিবে।” তন্তুবায় কন্যা অত্যন্ত আনন্দে একের মস্তক অন্যের দেহে সংযুক্ত করিয়া দিলেন। উভয়ই প্রাণ পাইয়া পুনর্জীবিত হইলেন এখন কোন ব্যক্তি এই কন্যার স্বামী হইবে?
কাহিনী – ৫
মহাউম্মগ্গ জাতক
বোধিসত্ত্ব এক জন্মে মহৌষধ কুমার নামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা শ্রীবর্ধন ছিলেন মিথিলার সন্নিহিত পূর্ব্বযবমধ্যক গ্রামের শ্রেষ্ঠী। মিথিলার রাজা নানা কৌশলে শ্রেষ্ঠীপুত্রের বুদ্ধি পরীক্ষা করিতেন, প্রতি বারই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া মহৌষধ পণ্ডিত সমাজে শ্রেষ্ঠাসন লাভ করিতেন।
(১) একদিন রাজা গ্রামবাসাদিগকে মহৌষধের নিকট প্রেরণ করিলে, বলিয়া পাঠাইলেন আমার দোলায় ক্রীড়া করিবার ইচ্ছা হইয়াছে। এখানে বালুকার যে পুরাতন রজ্জু ছিল, তাহা ছিন্ন হইয়াছে, তোমরা বালুকার দ্বারা একটি রজ্জু পাকাইয়া দিবে। যদি তাহা দিতে অসমর্থ হও তবে তোমাদের সহস্র মুদ্রা দণ্ড দিতে হইবে।” গ্রামবাসীরা নিরুপায় হইয়া মহৌষধের সম্মুখীন হইল। মহৌষধ তাহাদের আশ্বস্ত করিয়া কয়েক জন বচন কুশল লোককে আহ্বান করিলেন এবং তাহাদের কিছু শিখাইয়া দিলেন। তাহারা রাজার নিকট গিয়া বলিল—‘মহারাজ গ্রামবাসীরা বুঝিতে পারিতেছে না আপনার ঐ পুরাতন বালুকার রজ্জু কতটা স্থুল বা সূক্ষ্ম ছিল। অনুগ্রহ করিয়া ঐ পুরাতন বালুকা রজ্জুর বিতস্তি-প্রমাণ অন্তঃত চতুরঙ্গুলি প্রমাণ পাঠাইয়া বাধিত করুন। ঐ পুরাতন রজ্জু দেখিয়া আমরা প্রয়োজন মত স্থুল বা সূক্ষ্ম রজ্জু প্রস্তুত করিব। রাজা বলিলেন—‘আমার বাড়ীতে কখনও বালুকার রজ্জু ছিল না।’
বচনকুশল এক ব্যক্তি বলিল—‘মহারাজ, আপনি যদি নিদর্শন দেখাইতে না পারেন, যবমধ্যক গ্রামবাসীরা কিরূপে রজ্জু প্রস্তুত করিবে?’
রাজা প্রশ্ন করিলেন—‘কে এই প্রতিসম্ভা বাহির করিয়াছে?’
তাহারা বলিল—‘মহৌষধকুমার’।
(২) একদিন রাজা আদেশ করিলেন—‘আমার জলকেলি করিবার ইচ্ছা হইয়াছে। পূর্ববযবমধ্যক গ্রামবাসীদের পঞ্চবিধ পদ্ম সুশোভিত একটি পুষ্করিণী প্রেরণ করিতে হইবে। যদি তাহারা অসমর্থ হয়, তাহাদের সহস্র মুদ্রা দণ্ড দিতে হইবে।’
গ্রামবাসীরা মহৌষধের আশ্রয়প্রার্থী হইলেন। মহৌষধ কয়েক জন বাকপটু লোককে আহ্বান করিলেন। তাহাদের বলিলেন—
‘তোমরা অনেকক্ষণ জলকেলি করিবে যাহাতে তোমাদের চক্ষু রক্তবর্ণ হয়, তারপর আর্দ্রকেশে আর্দ্রবস্ত্র পঙ্কলিপ্ত দেহে রাজদ্বারে উপনীত হইয়া রাজাকে সংবাদ পাঠাইবে—তোমরা রাজদ্বারে তাঁহার দর্শন মানসে প্রতীক্ষা করিতেছ। তাঁহার অনুমতি লাভ করিলে রাজভবনে প্রবেশ করিবে এবং রাজাকে বলিবে— ‘মহারাজ, আপনি পূর্ব যবমধ্যক গ্রামবাসীদের একটি পুষ্করিণী পাঠাইতে আদেশ দিয়াছেন, আমরা আপনার আদেশানুসারে একটি বৃহৎ পুষ্করিণী লইয়া আসিতেছিলাম, কিন্তু সেই পুষ্করিণী বনবাসিনী। নগরীর প্রাকার, পরিখা, অট্টালিকা ও লোকজন দেখিয়া সে ভয়ে রজ্জু ছিঁন্ন করিয়া আবার বনেই পলাইয়া গিয়াছে। আমরা তাহাকে লোষ্ট্রদণ্ডে আঘাত করিয়াও আর ফিরাইতে পারিলাম না। আপনি ইতিপূর্বে জলকেলির জন্য বন হইতে যে পুষ্করিণীটি আনয়ন করিয়াছিলেন, তাহাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ করুন, তাহার সঙ্গে এই নূতন পুষ্করিণীকে জুড়িয়া তবে লইয়া আসিব।’ রাজা বলিলেন—
আমি পূর্বে কখনও কোন পুষ্করিণী বন হইতে আনয়ন করি নাই, পুষ্করিণী আনয়নের জন্যও অন্য পুষ্করিণী প্রেরণ করি নাই।’
‘তাহা হইলে মহারাজ, আমরাই বা কি করিয়া এই কাজ করিতে পারি?’
(৩) যবমঝক গ্রামের একটি প্রাচীন বনেদী অথচ গরীব শ্রেষ্ঠী পরিবারের বালিকাকে দেখিয়া মহৌষধ ভাবিলেন—কন্যাটি পরমা সুন্দরী, সর্বসুলক্ষণা এবং আমার পদচারিকা হইবার উপযুক্ত। কিন্তু এই নারী বিবাহিতা বা অবিবাহিতা তাহা তো জানি না। তিনি তাহার বুদ্ধি পরীক্ষার জন্য দূরে থাকিয়াই হস্ত মুষ্টিবদ্ধ করিলেন। বালিকা বুঝিল তিনি বিবাহিতা কি অবিবাহিতা পথিক তাহা জানিতে চাহিতেছেন। সেও নিজের মুষ্টি খুলিয়া দেখাইল। বোধিসত্ত্ব এইবার অগ্রসর হইয়া আসিলেন এবং প্রশ্ন করিলেন—
‘তোমার নাম কি ভদ্রে?’
বালিকা বলিল—‘প্রভু, যাহা পূর্বে হয় নাই, পরেও হইবে না, এখনও নাই—আমার নাম তাহাই।’
বোধিসত্ত্ব বলিলেন—‘জগতে অমর কিছুই নাই। তবে কি তোমার নাম অমরা?’
বালিকা উত্তর করিল—‘তাহাই প্রভু।’
—‘তুমি কাহার জন্য যবাগু লইয়া যাইতেছ?’
—‘পূর্ব দেবতার জন্য, প্রভু!’
বোধিসত্ত্ব বলিলেন—‘মাতাপিতাই পূর্ব দেবতা, তবে কি তুমি তোমার পিতার জন্য যবাগু লইয়া যাইতেছ?’
—‘হ্যাঁ, প্রভু!’
—‘তোমার পিতা কি করেন?’
—‘তিনি এককে দুই করেন।’
—‘একের দ্বিধাকরণকে কর্ষণ বলা হয়, তবে কি তিনি কৃষিকাজ করেন?’
—‘হ্যাঁ, প্রভু।’
—‘তিনি এখন কোথায় কৃষিকর্ম করিতেছেন?’
—‘যেখানে একবার গমন করিলে কেহ আর প্রত্যাগমন করে না।’
—‘ভদ্রে, তোমার পিতা কি তবে শ্মশানের নিকটে কৃষিকর্ম করিতেছেন?’
— ‘হ্যাঁ, প্রভু তাহাই।’
—‘তুমি আজই প্রত্যাবর্তন করিবে তো?’
—‘প্রভু, যদি আসে, তবে আসিব না, যদি না আসে তবে আসিব।’
—’ভদ্রে, যদি নদীতে বান আসে, তবে বোধ হয় তুমি ফিরিবে না, যদি বান না আসে তবে বোধ হয় ফিরিবে।’ —’হ্যাঁ, প্রভু, তাহাই ঠিক।’ এইবার বোধিসত্ত্ব বলিলেন—’আমি তোমার বাড়ী যাইব পথ বলিয়া দাও।’ অমরা বলিল—ভালোই, বলিতেছি শুনুন—
ছাতু আর আমানির দোকান দুটী আছে;
তার পর ফুটেছে ফুল কোবিদার গাছে।
যে হাতে খায় ভাত লোকে, সেই দিকে যাও;
যে হাতে খায় না কেহ, সেই দিক ছেড়ে দাও।
যব মধ্যক গাঁয়ে যেতে গুপ্ত পথ এই;
ঘটে আছে বুদ্ধি যার, জানতে পারে সেই।
কাহিনী – ৬
এক গ্রামে এক শিকারী বাস করত। সে তার বউয়ের নাকের নোলক হাতে ধরে রেখে প্রত্যেক দিন তার মধ্য দিয়ে তীর চালাত। একদিন সে শাশুড়ীকে জিজ্ঞাসা করল যে তার স্বামী রোজ তার নাকের নোলকের মধ্য দিয়ে তীর চালায়, সে কি উপায় করবে? শাশুড়ী বলল, ‘তুমি ছেলেকে বলবে তোমার মত শিকারী এই পৃথিবীতে অনেক আছে।’ শিকারী বউয়ের কথা পরীক্ষা করার জন্য দেশ ভ্রমণে বেরোল। যেতে যেতে অনেক দূর গিয়ে দেখল একটা মাঠে লোকেরা লাঙ্গল চালাচ্ছে। শিকারী তামাক খাবে বলে আগুন চাইল। আগুন দিয়ে তামাক খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের এখানে শিকারী আছে?’ তারা ‘হ্যাঁ’ বলল। তারা আরও জানাল যে সেই শিকারী এমন বীর যে সে তার বাড়ী থেকে তীর ছুঁড়লে তা আমাদের ক্ষেতের মধ্যে এসে পড়ে, আর আমরা তখন বুঝতে পারি যে আমাদের বাড়ী ফিরবার সময় হয়েছে। এমন সময় সেই শিকারী এল এবং উভয়ের মিলন হল। দুজনে ঐ দেশ থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং ঘুরতে ঘুরতে অনেক দূর গেল। সেখানে তারা এমন এক লোকের সন্ধান পেল যে ভাত খাওয়া হলেই এক দৌড়ে সে সমস্ত পৃথিবীটা ঘুরে আসে। তাকেও তারা তাদের দলে নিল। তিন জনে আবার তাদের যাত্রা শুরু করল। এমন সময় তারা এক অন্ধকে দেখতে পেল। সেই অন্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে কি দেখতে দেখতে আসছে। তিন জন তাকে জিজ্ঞাসা করল, সে অন্ধ অথচ কি দেখছে। সে বলল যে সে আকাশে অনেক অপ্সরী নাচতে দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু এরা তিনজন তাকে দেখতে পাচ্ছে না। এবার চারজন হল। তারা চলতে লাগল। যেতে যেতে এক রাজার দেশে এসে উপস্থিত হল। সেখানে গিয়ে দেখল সেই দেশের রাজার মেয়ের খুব অসুখ। তারা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলে মন্ত্রী জিজ্ঞাসা করল ‘তোমরা রাজকন্যাকে সুস্থ করতে পারবে কি না?’ পারবে বলায় তাদের রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজা তাদের খুব সম্মান করল। তাদের নানাভাবে আপ্যায়ন করল। এমন সময় অন্ধ বলল, আমি ওষুধটা পাব কোথায়? যেখানে সূর্য আছে সেখানে ওষুধ আছে, আমি পাব কি করে? বন্ধুদের বলায় তারা বলল একমাত্র যে এক দৌড়ে পৃথিবী ঘুরে আসে সে ছাড়া পাবে না। তখন সেই লোকটি খাওয়া দাওয়া সেরে ওষুধ আনতে এক দৌড়ে পৃথিবী ঘুরে আসতে বেরুলো, ওষুধ আনা হল। আসতে আসতে সে জঙ্গলের মধ্যে একটা বিরাট বটগাছ দেখতে পেল। সে সেখানে একটু বিশ্রাম করবে ভাবল, তারপর সে ওষুধ নিয়ে যাবে। বিশ্রাম করতে করতে গিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল। একটা সাপ তাকে খাওয়ার জন্য হাঁ করে গিলতে এল। বাকিরা বলল ওর ফিরে আসতে এত দেরী হচ্ছে কেন? এমন সময় অন্ধ উপলব্ধি করল যে একটা বিরাট সাপ যে বটগাছের তলায় বিশ্রাম করছে তা’ থেকে নেমে এসে তাকে গিলতে আসছে। সে তখন অপর দুজন শিকারীকে তীর ছুঁড়তে বলল। দুজনেই তীর ছুঁড়তে চাইল। অবশেষে যে নোলকের ফাঁকে তীর চালাত সে তীর ছুঁড়ল, তীরটা ছুটে গিয়ে সাপের মাথায় লাগল। সাপটি ছট্ফট্ করতে তখন অপর শিকারীটি তীর ছোঁড়া মাত্রই তীরটি তার পেটের মাঝখানে গিয়ে লাগল এবং পেটের নাড়ীভুঁড়ি বেরিয়ে এল। সাপের গোঙানিতে ইতিমধ্যে গাছের তলায় বিশ্রামরত ব্যক্তিটির ঘুম ভেঙে গেল, সে তাড়াতাড়ি ওষুধ নিয়ে উপস্থিত হল এবং রাজকন্যাকে ওষুধটা খাইয়ে দিল। রাজকন্যা বেঁচে গেল।
রাজকন্যাটিকে কে পাবে?
কাহিনী ৭
দুজন থাকে বীর। তারা একে অপরকে বড় বলে। এ নিয়ে চলে বাদানুবাদ। শেষে তারা ঠিক করল তারা একজনকে সাক্ষী মানবে, তাদের বীরত্বের পরীক্ষা দেবে। একদিন এক বুড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে খাবার নিয়ে তার ছেলের জন্যে। দুজন বীর এসে তাদের সমস্যার কথা জানাল এবং তাকে বিচার করতে বলল, কে বড় তাদের মধ্যে।
বুড়ির তাড়া ছিল তাই সে বলল তোরা দুজনে দু কাঁধে বসে ঝগড়া করতে করতে চল, আমি শুনি। দুই বীর তাই করতে করতে চলল। এমন সময় এক চিল এল, আর এক ধমকায় বুড়ি আর দুই বীরকে ঠোঁটে তুলে উড়ে চলল। এক দেশে এক রাজার মেয়ে ছাদে চুল শুকোচ্ছিল, সে যেই ওপর দিকে তাকাল অমনি চিলের ঠোঁট থেকে তারা তিনজন পড়ে গেল রাজকন্যার চোখে। রাজকন্যে তার দাসীকে বলল, চোখে কি পড়ল দেখতে। দাসী কাপড়ের খুঁট দিয়ে তাদের বের করে আনল। কে বেশী বীর?
কাহিনী – ৮
চারজন পাশা খেলছে। একটা মেয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছে। তার পিছনে একটা লোকও ছিল। মেয়েটি পিছন ফিরে তাকাচ্ছে। তখন যারা পাশা খেলছিল তারা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি পিছন ফিরে তাকাচ্ছ কেন? মেয়েটি তখন উত্তর করল—
আমার বাপের উয়ার বাপের শ্বশুর জামাই
পাশামণির পাশা খেল আমার হয় কেন পথের কামাই?
কাহিনী – ৯
চারটে ছেলে পাঠশালায় পড়তে গিয়েছিল। একটা ডোমনি সেই পথ দিয়ে টুকরী বিক্রি করতে যাচ্ছিল। তারা জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার পুরুষের (স্বামীর) নাম কি?’ তার উত্তরে ডোমনি বলল—
চার চৌদ্দং আরো চার
লেহ টোকি দেহ দাম।
আমার পুরুষের এই নাম।
কাহিনী – ১০
একজন লোক একটা মেয়েকে রং দিতে আসছিল, তখন মেয়েটি বলল ‘আমি কে জানিস?
‘আমার শ্বশুর বিয়ে করেছে তোর শ্বশুরের মাকে।’
তখন গুরুজন সম্পর্ক ভেবে রং না দিয়ে চলে গেল।
কাহিনী – ১১
এক ছিল ভীষণ বড় বীর। কিন্তু ভীষণ বড় বীর হলে কি হবে, তার ঘরে খাবার অভাব। কিছু উপার্জনের প্রত্যাশায় সে ভাবলো বিদেশে যাই। স্ত্রীকে বললো, ‘কুঁড়ো (ছাতু) বেঁধে দাও, রাস্তায় খিদে পেলে খাবো।’ খাবার নিয়ে বীর পথে বেরুলো। যাচ্ছে, অনেক দিন পেরোলো, অনেক মাস পার হয়ে বছর ঘুরে গেল প্রায়—বীর হেঁটেই যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে একটা পুকুর দেখতে পেয়ে বীরের মনে হলো তার খিদে পেয়েছে। সঙ্গে কুঁড়ো ছিল, সে পুকুরের জলে সেগুলো ভিজতে দিলো, বিরাট পুকুরে তার কুঁড়োগুলো গেলো হারিয়ে। কিন্তু বীর তার জন্য বিব্রত নয়, সে পুকুরের সমস্ত জলই খেয়ে নিলো। এদিকে ঐ পুকুরে রোজ একটা হাতী জল খেতে আসতো, সে যথানিয়মে, যথাসময়ে এলো। শুষ্ক পুকুর দেখে হাতী তো রেগে খুন। সারা শরীর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাতী খুঁজতে লাগল, কোথায় সেই লোক যে এমন কাণ্ড করেছে। বীরকে দেখতে পেয়েই শুঁড় দোলাতে দোলাতে বীর বিক্রমে ছুটলো বীরকে সংহার করতে। হাতী তার দিকে ছুটে আসছে দেখেও বীর নির্ভয়ে বসে রইলো। হাতী কাছে আসতেই বীর তাকে আছড়ে ফেলে ট্যাঁকে গুঁজে রাখল অনায়াসে।
তারপর আবার পথ চলতে শুরু করলে সে। চলতে চলতে হঠাৎ দেখতে পেলো যে ২দিনের একটা ছেলে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে। তখন সেই বীর সেই হাতী ট্যাঁক থেকে বের করে ছেলেটার সামনে ফেলে দিল। ছেলেটা দেখলো তার ঝাঁটার সামনে কি একটা পড়লো, সে সেটাকে ছুঁচো মনে করে ঝেঁটিয়ে ফেলে দিল। বীর এই ব্যাপার দেখে তো অবাক। বীর ভাবতে লাগল যে যার ছেলে এমন, তার বাবা না জানি কত বড় পালোয়ান। বীরের ইর্ষা হলো, ভাবলো ছেলেটার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে জয়ী হতে হবে। ছেলেটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো যে তার বাবা কোথায়? ছেলেটা বীরের রাগকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জানালো যে তার বাবা গেছে সাতাশ’ গাড়ী নিয়ে বনে কাঠ কাটতে। ছুটতে ছুটতে বীর পেছনের গাড়ীটা ধরে টান মারলো। ছেলেটর বাবা কি একটা ধাক্কা অনুভব করে পেছনে ফিরে দেখে বীর দাঁড়িয়ে। সে বললো, ‘যদি বীর হও তো এস আমার সামনে।’
তারপর বাঁধলো তুমুল যুদ্ধ। যুদ্ধে এত ধূলো উড়তে লাগলো যে চারিদিক আঁধি হয়ে গেলো। সেই সময় এক কাঁড়া পাইকার ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল।
তারা ভাবলো, ইস্, যদি কাঁড়াগুলো উড়ে যায় ধুলো ঝাড়ে। ভয় পেয়ে তাদের একজন কাঁড়াগুলি একসঙ্গে বেঁধে মাথায় তুলে নিল।
ঠিক সেই সময়েই একটা চিল উড়তে উড়তে যাচ্ছিল, কাঁড়া পাইকারদের মাথার ওপর দিয়ে। চিলটা ভাবল, ওদের মাথায় বোধহয় কিছু খাবার। এই ভেবে চিলটা ছোঁ মেরে ঐ পুঁটলিটা নিয়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। যেতে যেতে পথে পড়লো রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের ছাতে ছিল অপরূপ সুন্দরী এক রাজকন্যা দাঁড়িয়ে। চিলটার পা ফস্কে রাজকন্যার চোখে ঐ কাঁড়াগুলি উড়ে পড়লো। দাসী ছিল রাজকন্যার পাশেই। তাকে রাজকন্যা বললো, দ্যাখতো, দাসী, চোখে কি যেন পড়লো। দাসী কাপড়ের খুঁটে কাঁড়াগুলি বের করে নিল।
এখন বলতো কে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বীর? —
কাহিনী – ১২
চারিটি লোক একসঙ্গে গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের বিপরীত দিক দিয়ে একটি লোক আসছিল। এই চারজনকে দেখে সে হাত জোড় করে নমস্কার করে চলে গেল। কিছুদূর যাবার পর চার জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেল। সবাই বলে, তোকে নয়, আমাকে নমস্কার করেছে। কিছুতেই এর সমাধান হোল না দেখে চারজনেই ঠিক করল, লোকটিকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করা উচিত। তারপর লোকটিকে ডেকে আনল। লোকটি বলল, আমি কাউকেই নমস্কার করিনি। অনেক বলার পর সে বলল, আপনাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বোকা, তাকে আমি নমস্কার করেছি। তখন চার জনের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেল। সবাই বলে, আমিই সবচেয়ে বোকা।
প্রথম জন বলল, আমি সবচেয়ে বেশি বোকা, কারণ, একদিন আমি মামার বাড়ী যাচ্ছিলাম। বাবা আমাকে একটা ঘটি দিল, ঘি আনার জন্যে। পথে যেতে খুব খিদে পেল, গ্রামের একটা লোকের কাছ থেকে আমি এক আনার মুড়ি কিনলাম। মুড়িগুলি ঘটির মধ্যে রেখে দিলাম, কিন্তু খাবার সময় ঘটি থেকে মুঠো ভরা হাত কিছুতেই তুলতে পারলাম না। সারাটা রাস্তায় না খেয়ে রইলাম। এবার বলুন, এর চেয়ে কেউ কি বেশি বোকা? আমিই বেশি বোকা, অতএব আপনি আমাকেই নমস্কার করেছেন।
দ্বিতীয় জন বলল, আমি সবচেয়ে বেশি বোকা; কারণ, একদিন আমার স্ত্রী ধোপাকে ডেকে কাপড়গুলো ধুতে দিতে বলল। কিন্তু আমি ধোপাকে না ডেকে মাথায় কাপড়গুলি বেঁধে রজকের বাড়ীতে গিয়ে ফেলে দিয়ে এলাম; অতএব আমিই সবচেয়ে বোকা, আপনি আমাকেই নমস্কার করেছেন।
তৃতীয় জন বলল, আমি সবচেয়ে বোকা; কারণ, আমার দুজন স্ত্রীকে একদিন দুপাশে নিয়ে শুয়ে আছি, হাত দুটো দুজনার কাছে। এদিকে আমার চোখে পিঁপড়ে কামড়াতে আরম্ভ করলো, কিন্তু কোন হাত দিয়েই তাড়াতে পারলাম না; কেননা, যে হাতই তুলি না কেন, আমার স্ত্রীরা রেগে যাবে; অতএব আমিই বোকা। আপনি আমাকেই নমস্কার করেছেন।
চতুর্থ জন বলল, আমি সবচেয়ে বোকা, কারণ, একদিন আমার স্ত্রীকে বৈঠকখানায় তামাক দিয়ে আসতে বললাম; কিন্তু স্ত্রী রাজী হোল না, কেন না উঠনের জলে তার পায়ের আলতা উঠে যাবে। তখন আমি হুঁকো শুদ্ধ কাঁধে করে স্ত্রীকে নিয়ে গেলাম বৈঠকখানায়; অতএব আমিই সবচাইতে বোকা।
কাহিনী – ১৩
একজন বড় লোকের ছেলে ছিল। খুব বড় ঘরে তার বিয়ে হোল। কিন্তু অগাধ সম্পত্তি হাতে পাওয়ার জন্য তার স্বভাব নষ্ট হয়ে গেল। বাবার সম্পত্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় সে বউকে নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। শ্বশুর বাড়ীতে সে প্রচুর আদর যত্ন লাভ করল। কয়েক দিন বাদে মা তার কন্যাকে প্রচুর গয়না গাঁটি ও কাপড় চোপড় দিয়ে জামাইয়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু জামাইএর নজর কি ভাবে সে বউয়ের সম্পত্তি হস্তগত করবে। রাস্তার ধারে একটা খাল দেখে তার দিকে বউকে ঠেলে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল। সেই পথ দিয়ে অনেক পথিক যাচ্ছিল। তারা মেয়েলী কান্না শুনে ছুটে এসে বউটিকে বাঁচিয়ে তুলল এবং তার বাড়ীতে পাঠিয়ে দিল। মেয়েটি কিন্তু সবই জানত, অথচ পতির নিন্দা হবে বলে কিছু স্বীকার করল না। মার কাছে অতি দুঃখে দিন কাটাতে লাগল। এইভাবে তিন চার বৎসর কেটে গেল। জামাইয়ের সমস্ত সম্পত্তি ফুরিয়ে গেল। ভাবল এই বার আমার শ্বশুর বাড়ীতে যাই, পূর্বের ঘটনা কারোর মনে নেই। শ্বশুর বাড়ীতে জামাই আদর পেল। আবার কন্যাকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে জামাইয়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিল। এবার জামাই সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে বউটিকে হত্যা করল। ফলে সে চিরদিনের মত সম্পত্তি ও বউ হারাল। এখানে দুজনেই দোষী, কিন্তু কে বেশী দোষী ?
ব্যাখ্যা ১–এখানে ইঙ্গিতগুলিকে ধাঁধা এবং সর্বাধিকুমার দ্বারা ইঙ্গিত-গুলির ব্যাখ্যা ধাঁধার ব্যাখ্যা বলিয়া মনে করিতে হইবে।
ব্যাখ্যা ২– ত্রিবিক্রম অস্থি সঞ্চয় দ্বারা মধুমালতীর পুত্র স্থানীয় হইয়াছে। আর বামন জীবন দান দ্বারা পিতৃস্থানীয় হইয়াছে। অতএব ন্যায়ানুসারে মধুসূদন তাহার যথার্থ অধিকারী। কারণ, সে ভস্মরাশি সংগ্রহ করিয়া ও শ্মশানবাসী হইয়া যথার্থ প্রণয়ীর কাজ করিয়াছে।
ব্যাখ্যা ৩–মহাদেবীকে উদ্ধার করিয়াছে সেই বরই কন্যা লাভের প্রকৃত অধিকারী।
ব্যাখ্যা ৪ – দেহের সমুদয় অঙ্গের মধ্যে মস্তক উত্তম, সুতরাং যে ব্যক্তির কলেবরে পূর্ব্ব স্বামীর উত্তমাঙ্গ সংযোজিত হইয়াছে, সেই তাহার স্বামী হইবে।
উত্তর ৬ — যে নোলকের ফাঁকে তীর ছুঁড়েছিল সে।
উত্তর ৭ — দাসী।
উত্তর ৮ — মা-বেটা
উত্তর ৯ — ঘাটু।
উত্তর ১০ — মামী শাশুড়ী
উত্তর ১১ – দাসী
উত্তর ১২ – প্রথম জন সব চেয়ে বেশি বোকা।
উত্তর ১৩ – বউটিই বেশী দোষী।