gnijuger-katha-manabendra-nath-roy
নরেন, তুমি ঈশ্বর মানো ?
কলেজ স্কোয়ারে; শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসের, ছোট ঘরটিতে। আনন্দ বাজার পত্রিকার সুরেশ মজুমদার আছেন ৷ তা ছাড়া আছেন, অমর চ্যাটার্জী,অতুল ঘোষ, এম এন রায়,সতীশ চক্রবর্তী, আরও দু‘চার জন । চায়ের মজলিস। বেশ জমে উঠেছে। হাল্কা হাসি আর গল্প চলছে। ঘরোয়া বৈঠক । হঠাৎ অমর চ্যাটার্জী বলে বসলেন।
আচ্ছা নরেন, তুমি ঈশ্বর মানো?
প্রশ্নটি নিছক পরিহাস, কল্পনা করে, নরেন, হাসতে –লাগলেন ।
আমি কিন্তু ঈশ্বর মানি । তোমাকে আমার, অ্যাবসকণ্ডিং পিরিয়ডের –একটা অদ্ভুত গল্প বলবো। অনেকের বিশ্বাস হবে না । কিন্তু সত্যি। করুণাময়ের অসীম করুণা উপলব্ধি করলাম।
সেটা ১৯১৮ সাল । ফেরার অবস্থায়, পালাতে পালাতে – আসামের এক দুর্ভেদ্য জঙ্গলে গিয়ে পড়েছি। সঙ্গে চার জন অনুগামী। জায়গাটার নাম জানিনা। হঠাৎ বুঝলাম । এই দুর্গম পথের সন্ধান ও পুলিশ পেয়েছে। আমরা ঘেরাও হয়েছি। চারিদিকে ঘন অন্ধকার । রাত্রি কাল। হঠাৎ পুলিশ গুলি ছুড়তে আরম্ভ করলো ৷ আমরা শুয়ে পড়লাম ।বন্ধুরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে তার উত্তর দিলেন। উভয় পক্ষে প্রচণ্ড ভাবে গুলির বিনিময় হোল ।
কিছুক্ষণ পরে মনে হোল । পুলিশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে । তখন আমি উল্টো দিকে ছুটতে আরম্ভ করলাম। মরিয়া হোয়ে রাতের অন্ধকার ছুটেছি। চারিদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার । আর দুর্ভেদ্য জঙ্গল। কোথায় চলেছি জানি না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছুটেছি। আর পারি না। ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়লাম
একটা গাছের তলায় পড়ে গেলাম । আর চলতে পারি না । ঘন বন। দুর্ভেদ্য জঙ্গল ।
গাছের তলায় পড়ে আছি। কতক্ষণ পড়ে আছি, তাও জানিনা। জ্ঞান হোল।
কিছুই মনে করতে পারছিনা। কোথায় আমি ? শুধু ভাবছি। এ কোথায় এলাম ৷ জায়গাটির কি নাম । তাও জানিনা ।অজানা–অচেনা পথ।সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান। যতদূর দৃষ্টি যায় ; ঘনকৃষ্ণ বন। আর গভীর জঙ্গল। পথ–ঘাটের চিহ্ন মাত্র নেই। সমূহ বিপদ। জীবনটা একটা সরু রেশমী সুতায় ঝুলছে। ধরলেই ফাঁসী। আমার মাথার ওপর কয়েক হাজার টাকা ধার্য আছে।
হঠাৎ একটা বাঘের ডাক্। চমকে উঠলাম। একটু দূরে একটা প্রকাণ্ড বাধ দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো যেন আগুনের ভাটার মত জ্বল জ্বল করছে।
আশ্চর্য হয়ে দেখলাম। বাঘ আমার দিকে ফিরে ফিরে চাইছে। তারপর আস্তে আস্তে চলতে আরম্ভ করলো। সেই বন–পথ ধরে। বাঘ চলছে। লেজ নাড়তে নাড়তে। যেন বলছে, – আমার সঙ্গে এস । আমিও বাঘকে অনুসরণ করলাম। আস্তে আস্তে অগ্রসর হচ্ছি। বাঘ আমার কাছ থেকে; মাত্র বিশ কি পঁচিশ হাত দূরে। ইচ্ছে করলে ; এক লাফে আমার ঘাড় মটকাতে পারে ।
কিন্তু কই ? বাঘের চোখে কুটিল হিংস্র দৃষ্টি নেই। বাঘ চলেছে। আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে ফিরে দেখছে। আমি ঠিক বাঘকে অনুসরণ করতে পারছি কিনা। যেন বলছে, ভয় কি ? চলে এস। বাঘের চোখের ভাষা। যেন বুঝতে পারলাম। আমার পরম বন্ধু। মনে হোল বাঘ রূপী নারায়ণ !
তারপর এ জঙ্গল, সে জঙ্গল। বাঘ পার হোল। আমিও চলেছি। বাঘের পিছু পিছু। এ পথ, সে পথ। কত পথ ঘুরলো । দীর্ঘ পথ । দুজনে চলেছি। কতক্ষণ চলেছি। মনে নেই ।
হঠাৎ সামনে দেখলাম । একটা ছোট নদী । ভাবলাম কি করে নদী পার হব । বাঘ ও দাড়িয়ে গেল । একবার পেছনে ফিরে আমার দিকে তাকাল। তারপর জলের মধ্য দিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। আমিও বাঘের ঠিক পেছনে পেছনে নদী পার হলাম । আশ্চর্য ! যেন নেশার ঘোরে চলেছি।
অনেক ক্ষণ চলেছি। বাঘের নির্দিষ্ট পথে যাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়লো ; দূরে উঁচু রেলওয়ে লাইন। বাঘ সেই রেলের লাইনে লাফিয়ে চড়লো। আমি রেলের লাইনে এসে দাড়ালাম । আরও আশ্চর্য। বাঘ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ডিসটেন্ট সিগলানের দিকে। দেখলাম সিগনাল ডাউন হয়েছে। সবুজ আলো । এখনই ট্রেন আসবে । বাঘ সবুজ আলোর দিকে দুবার তাকাল। তারপর তাকাল,আমার মুখের দিকে। শেষে মারলো একটা প্রকাণ্ড লাফ সম্মুখে আর একটা ঘন জঙ্গলে। তার মধ্যে মুহূর্তে বাঘ অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন বলে গেল,—এই পথে পালাও। সামনেই রেলওয়ে ষ্টেসন । সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন এসে পড়লো। আমি ট্রেনে চেপে বসলাম । ট্রেন ছেড়ে দিল। আমিও নিশ্চিন্ত। সে যাত্রা রক্ষা পেলাম ৷
সময় পেলে পরে না হয় একদিন শোনাব কি করে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য থেকে সি. মার্টিন, ডা. মাহমুদ বা আমেরিকা থেকে মেক্সিকো যাবার প্রাক্কালে মানবেন্দ্রনাথ রায় হয়ে ওঠার কাহিনী।