ধাঁধা – সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিকতা
প্রশ্ন ১. ধাঁধা কী? ধাঁধার উৎপত্তি বিষয়ক সংক্ষিপ্ত একটি ধারণা দাও।
উত্তর: ধাঁধা বা Riddle: সংস্কৃত ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দ থেকে ‘ধাঁধা’ শব্দের উৎপত্তি (দ্বন্দ্ব > ধন্দ > ধন্ধ > ধাঁধা)। ধাঁধাকে Riddle (ইংরেজি), Ainigma (গ্রিক), Enigma (ল্যাটিন), পহেলী (হিন্দি), হেঁয়ালি ও প্রহেলিকা (বাংলা) ইত্যাদি প্রতিশব্দে চেনা যায়। ধাঁধায় বক্তা কোনো একটি বিষয়কে রূপকের আড়ালে, সংক্ষিপ্ত শব্দবন্ধে উপস্থাপন করেন এবং শ্রোতা সেই বুদ্ধিদীপ্ত বাক্য সমাহারে লুকিয়ে থাকা আড়ালে এক চমকপ্রদ উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। ধাঁধা আসলে এক রকমের ঐতিহ্যবাদী জ্ঞানের ভাণ্ডার। আমরা একে প্রবাদের জ্ঞাতি হিসেবে গণ্য করতেই পারি। কারণ ধাঁধা ও প্রবাদ এদের দুয়ের মাধ্যমেই একটি জাতির বা সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিচিত্র অভিব্যক্তি উদ্ভাসিত হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা সহজসরল ভঙ্গি এবং অপ্রত্যাশিত কিংবা অকল্পিত কিছু উপমা বা তুলনা রূপকের মাধ্যমে ধাঁধা তথা হেঁয়ালির ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়।
ধাঁধার উৎপত্তি: লোকতাত্ত্বিকগণের মতে, ধাঁধা লৌকিক সাহিত্যের এক অতিপ্রাচীন সৃষ্টি। বহুকাল আগে থেকেই প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা, গ্রিস প্রভৃতি দেশে এর ব্যাপক প্রচলন লক্ষ করা যায়। সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে ধাঁধা আজও তার আপন মহিমা অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছে। প্রখ্যাত পণ্ডিত মরিস ব্লুমফিল্ড বলেছেন, “সুপ্রাচীন কাল থেকেই আদিম মানুষের মন পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলতে যে চেষ্টা করে চলেছে, তারই পরিণতি হিসেবে ধাঁধার সৃষ্টি”প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লিখিত সাহিত্যের অনেক আগেই ধাঁধা মানুষের অন্তরঙ্গ সঙ্গী হিসেবে বুদ্ধিমত্তা যাচাই কিংবা অবসর বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, বাইবেল, চর্যাপদ ও অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে ধাঁধার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
২ ধাঁধার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দাও। ধাঁধার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর ধাঁধার উৎপত্তি: মানবমনের গভীর রহস্যানুভূতির কাব্যিক ও তির্যক প্রকাশ ধাঁধা। বেশিরভাগ লোকতাত্ত্বিক মনে করেন, ধাঁধা লৌকিক সাহিত্যের প্রাচীন সৃষ্টি। ধাঁধার উৎপত্তি বিষয়ে অনেক অভিমতের একটি এম ব্লুমফিল্ডের। আদিম সমাজের শৈশবকালে ধাঁধার উৎপত্তি হয়ে থাকবে, যা সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সংগতি রেখে ক্রমে পরিবর্তিত ও জটিল রূপ লাভ করেছে। বহুকাল পূর্বে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার শিক্ষাসূত্রে ধাঁধার ব্যবহার লক্ষ করা গিয়েছিল। এমন নিদর্শনও অবলক্ষিত নয় যে, প্রাচীন গ্রিস থেকে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ‘ধাঁধাযুদ্ধ’ একদা ছড়িয়ে পড়েছিল। কোথাও কোথাও ধাঁধাযুদ্ধে হারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধিও চালু ছিল। এ থেকে প্রমাণ হয়, ধাঁধার রূপ যেমনই হোক, তা সমাজজীবনের অঙ্গীভূত ছিল।
ড. শহীদুল্লাহর মতে—ধাধা বা হেঁয়ালি প্রাচীন জগতের সৃষ্টি। উদাহরণ টেনে তিনি দেখান, সফোক্লিসের রচনায় কিংবা ঋগবেদেও ধাঁধার অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। কেউ কেউ আবার সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, পুরাকাহিনি, গাথা ইত্যাদি থেকে ধাঁধার উৎপত্তি ঘটেছে বলে অভিমত পোষণ করেন। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে, ধাঁধা লিখিত সাহিত্যের অনেক আগেই সৃজিত হয়ে, মানুষের মনের খোরাক অর্থাৎ অবসর বিনোদনের বিষয় হয়ে উঠেছিল। ধাঁধার অস্তিত্ব বিরাজমান থাকতে দেখা যায়—পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত, জাতক ইত্যাদি মহাগ্রন্থে। বাইবেল, আরব্য-পারস্য সাহিত্যেও ধাধা ছিল তার দাম্ভিক অস্তিত্ব নিয়ে। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এও ধাঁধার অস্তিত্ব ধরা পড়ে।
ধাঁধার ক্রমবিকাশ: দেশ-কাল-জাতির গণ্ডি পেরিয়ে ধাঁধা আজও স্বমহিমায় বিরাজমান। প্রাচীন সাহিত্যের বহু জায়গায় ধাঁধা ও হেঁয়ালির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। ক্যুনিফর্ম লিপি বিশেষজ্ঞরা প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার পোড়ামাটির ফলকে লিপিবদ্ধ বিভিন্ন পাঠমালার মধ্যে হেঁয়ালির সন্ধান পেয়েছেন (আনুমানিক ৩৫০০ খ্রি. পূ.)। এ ছাড়া মিশরীয় ‘বুক অফ ডেড’ (আনুমানিক: ৩০০ খ্রি.পূ.), ‘ঋক্সংহিতা’ (আনুমানিক: ১৫০০ খ্রি.পূ.), ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ (আনুমানিক ১০০০ খ্রি. পূ.), ‘মহাভারত”, “গ্রিকপুরাণবৃত্ত’, ‘বৌদ্ধজাতক কাহিনিমালা’ প্রভৃতি সুপ্রাচীন গ্রন্থে ধাধার নিদর্শন মেলে। এইসব পরিশীলিত সাহিত্য নিদর্শনগুলি লৌকিক সংস্কৃতি থেকে বাহিত হয়ে এসেছে বলেই এদের মধ্যে ধ্রুপদি সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও মূল উপাদানগুলি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি—ধাঁধা থেকে গিয়েছে স্বস্থানে।
ধাঁধার ঐতিহাসিক গুরুত্ব: কথিত আছে, খ্রিস্টপূর্ব নবম শতকে গ্রিক মহাকবি হোমার জোঁক সম্পর্কিত একটি ধাঁধার উত্তর দিতে না পেরে লজ্জায় প্রাণত্যাগ করেন। আরব দেশেও চতুর্থ শতকে হাজি খলিফা বা বসোরা অঞ্চলের আল হারিরি উৎকৃষ্ট ধাঁধার জন্য সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিলেন। আরব্য উপন্যাস, ইহুদি গ্রন্থ, বাইবেল, স্পেনীয় ক্রবাদুর সাহিত্য, পারস্য সাহিত্য—সর্বত্রই ধাঁধার অজস্র নমুনা পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য, কথা ও প্রবাদের মতোই বহু ধাঁধাও বিশ্বজনীন।
প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেও চর্যাপদ-সহ মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল, ঘনরামের ধর্মমঙ্গল প্রভৃতি গ্রন্থে ধাঁধার বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রাচীন ঋগবেদেও ধাঁধার নিদর্শন আছে। মহাভারতেও প্রচুর ধাঁধার নমুনা পাওয়া যায়।
ধাঁধাগুলি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়, স্মৃতিধার্য হয়ে ওঠে এবং বহু শতাব্দী ধরে টিকে থাকে। পারস্য ভাষার ভূতীনামা বা তোতাকে বলতে দেখা যায়—“বন থেকে বেরুলো টিয়ে / সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।” এই ধাঁধাটিই সামান্য কথাভেদে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশে শুধু নয় সুদূর ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, আয়ার্ল্যান্ড এমনকি আমেরিকাতেও পাখি, শিকারি, সন্ন্যাসী প্রভৃতি উপমায় উপস্থিত রয়েছে।
প্রশ্ন ৩ ধাঁধার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে অন্তত দুটি ধাঁধার উদাহরণ দাও।
উত্তর ধাঁধার বৈশিষ্ট্য: ধাধার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল—
১ ধাঁধার মধ্যে রূপকের ব্যবহার সুস্পষ্ট।
২ ধাঁধা কখনোই এককভাবে উপভোগ করা সম্ভব নয়, কারণ ধাঁধায় একজন প্রশ্নকর্তা এবং একজন উত্তরদাতা থাকা আবশ্যক। আর প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতা উভয়েরই মানসিক সক্রিয়তা বিশেষ প্রয়োজনীয়।
৩ ধাঁধার উপস্থাপনায় ভাষার চাতুরি, বুদ্ধি ও চিন্তার উৎকর্ষ এবং স্বচ্ছ ছন্দজ্ঞান প্রকাশ পায়।
৪ ধাঁধার মধ্যে একটি জিজ্ঞাসা থাকে এবং তার উত্তরটি অনুক্ত থাকে। প্রশ্নের মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে থাকে সেই উত্তর যা পাঠক বা শ্রোতাকে খুঁজে বের করতে হয়।
৫ হাস্যরসের পাশাপাশি বুদ্ধির অনুশীলনও ধাঁধায় গুরুত্বপূর্ণ। ধাঁধার মধ্যে সম্বোধনমূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় ভঙ্গিই লক্ষ করা যায়।
৬ রূপক আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে বলে ধাঁধা সমাধানে প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতা দুজনেরই সমান সক্রিয়তা, রসবোধ এবং লৌকিক বিষয়জ্ঞানের আবশ্যকতা আছে।
৭ ধাঁধার সমাধান সম্ভব হলে একপ্রকার মানসিক প্রফুল্লতা লাভ হয়।
৮ ধাঁধা সংক্ষিপ্ত গ্রাম্য অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দময় রচনা।
৯ ধাঁধায় গৃহস্থের শিলনোড়া, ছাতা, জুতো থেকে শুরু করে প্রকৃতির গ্রহনক্ষত্র, লতা, বন, বৃক্ষ ছাড়া চাঁদ, আকার, সংখ্যা ইত্যাদি নানা বিষয়েরও সমান মেলে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—
o “আল্লার কি কুদরৎ / লাঠির মধ্যে সরবং।”
উত্তর: আখ।
o “বন থেকে বেরোলো চিতি / চিতি বলে তোর পাতে মুতি।”
উত্তর: পাতিলেবু। (লেবুর রস দিয়ে অন্ন বা খাদ্যগ্রহণ প্রসঙ্গে)
o “শহর থেকে এল সাহেব, কোট প্যান্ট পরে
কোট প্যান্ট খোলার পরে চক্ষু জ্বালা করে।”
উত্তর: পেঁয়াজ।
o “চোদ্দ চরণ দশটি নয়ন / পাঁচটি মুণ্ড চারটি জীবনা”
উত্তর: মড়ার খাটিয়া বওয়া। [খাটিয়ার চারটি পা + চার জন বাহকের আটটি পা + মৃতদেহের দুটি পা অর্থাৎ মোট চোদ্দো চরণ (পা), বাহক ও মৃতদেহ মিলিয়ে দশটি নয়ন (চোখ) এবং শুধু চার জন বাহকই জীবিত।]
উদাহরণ:
এক মায়ের দুই ছেলে / কেউ কাউকে দেখতে নারে। (চক্ষু/চোখ)।
ছোটো প্রাণী হেঁটে যায় / আস্ত পা-টা গিলে খায়। (জুতো)।
প্রশ্ন ৪ ধাঁধা কী ও ‘ধাঁধা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি কোথা থেকে? ‘ধাঁধা’-র ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নির্দেশ করে, ভাষা ও অঞ্চলভেদে ধাঁধার নামবৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ধাঁধা: সংক্ষিপ্ত বাক্যে, রূপকের মোড়কে, প্রশ্নের আকারে একটি ভাবকে যখন জোরের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়; তখন তাকে ‘ধাঁধা’ বলা যেতে পারে। ইংরেজিতে ধাঁধাকে বলা হয় Riddle। ধাঁধায় একটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনায় শ্রোতা বা পাঠকের কাছে একটি জিজ্ঞাসাকে পৌঁছে দেওয়া হয়, যার মধ্যে উত্তরটি অনুক্ত থাকে।
• ধাঁধা শব্দের ব্যুৎপত্তি: সংস্কৃত ‘দ্বন্ধ’ শব্দ থেকে ধাঁধার উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। দ্বন্ধ > ধন্দ > ধাঁধা।
• ‘ধাঁধা’ অর্থ: সংস্কৃত ‘দ্বন্ধ’ শব্দজাত ‘ধন্দ’ থেকেই ধাঁধা শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ ধাঁধা শব্দের অর্থ করেছেন—’কৌতুককর কূট প্রশ্ন’ বা ‘হেঁয়ালি’ (Puzzle)। রাজশেখর বসু তাঁর ‘চলন্তিকা’-য় ধাঁধা শব্দটি ‘দ্বন্ধ’ শব্দজাত বলে তার অর্থ করেছেন—’কৌতূহলজনক দুরূহ প্রশ্ন’। ইংরেজিতে ধাঁধাকে বলা হয় ‘riddle’, যার উৎপত্তি অ্যাংলো-স্যাক্সন শব্দ ‘Readin’ থেকে। এর বাংলা অর্থ হেঁয়ালি। সংস্কৃত ‘প্রহেলিকা’ থেকেই এই ‘হেঁয়ালি’-র ধারণার উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
• ভাষাভেদে ধাঁধার ভিন্ন নামকরণ: ধাঁধাকে বিভিন্ন ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন—সংস্কৃতে ‘প্রহেলিকা’ বা ‘প্রভালিকা’ শব্দটি ধাঁধার সমার্থক। আবার, পালিতে ‘পান্থহ’, ওড়িয়া ভাষায় ‘পাজকিড়া’, উর্দুতে ধাঁধাকে ‘পহেলিয়া’ বলা হয়।
• অঞ্চলভেদে ধাঁধার ভিন্ন নামকরণ: ভাষার মতো অঞ্চলভেদেও ধাঁধা বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন—পুরুলিয়ায় ‘বাতকথা’, কোচবিহারে ‘ছিলকা’, বাংলাদেশে ‘দিস্তান’ প্রভৃতি নামে ধাঁধাকে উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্ন ৫ সাহিত্যিক ধাঁধা ও আধ্যাত্মিক ধাঁধার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর সাহিত্যিক ধাঁধা: লৌকিক ধাঁধাকে অবলম্বন করেই সাহিত্যিক ধাঁধা রচিত হলেও এতে লৌকিকতার সঙ্গে সাহিত্যিক গুণের সমন্বয় ঘটে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের ধারায় ধাঁধার প্রচলন ছিল। বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদে ধাঁধার প্রচলন থাকার একটি নিদর্শন হল—
“তিনশ চছুপই হরণা পিবই ন পানী।
হরিণা হরণির নিলঅ ণ জানী।।”
একইভাবে, মঙ্গলকাব্যেও ধাঁধার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে রয়েছে শুকপাখির ধাঁধা—
“বিধাতা নির্মাণ ঘরে নাহিক দুয়ার।
তাহাতে পুরুষ এক বৈসে নিরাহার।।
যখন পুরুষবর হয় বলবান।
বিধাতা সৃজন ঘর করে খান্ খান্।।”
উত্তর: ‘ডিম’।
এ ছাড়াও, মহাভারত থেকে জানা যায় যে; যুধিষ্ঠিরকে, বকরূপী ধর্মরাজ ধাঁধার আকারে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন।
‘কথাসরিৎ সাগর’-এর রাজকন্যা উদয়বতীকে, বিমলাবতী ধাঁধা যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন।
আবার, আধুনিক সাহিত্যে, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে অনন্তর মা বাসন্তী পরবের দিনে সময় অতিবাহিত করেছে দিনরাত ধাঁধার প্রয়োগ ঘটিয়েই। সাহিত্যিক ধাঁধার এইসকল নিদর্শন উল্লেখযোগ্য।
আধ্যাত্মিক ধাঁধা: আধ্যাত্মিক ধাঁধাগুলি মূলত সাহিত্যিক ধাঁধারই অন্তর্গত। এইপ্রকার ধাঁধাগুলির অর্থ অত্যন্ত গূঢ় হয়। ফলত, ধাঁধার প্রশ্নের উত্তর উদ্ঘাটন অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কেবল গুরুর কাছ থেকেই শিষ্যরা ধাঁধার অর্থ জানতে পারেন। এই কারণেই চর্যাপদে ‘গুরু পুচ্ছি অ জান’ তথা গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জানার কথা বলা হয়েছে।
মধ্যযুগের নাথ সাহিত্যে আধ্যাত্মিক ধাঁধার প্রচলন লক্ষ করা যায়। ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এ রাজপুত্র গোপীচন্দ্র তাঁর জননীকে যোগসাধনা বিষয়ক, জ্ঞানপরীক্ষামূলক, যোগশাস্ত্রের কতকগুলি ধাঁধা জিজ্ঞাসা করেছিল—
‘চারি চকরি পুকুরখানি, মা, মধ্যে ঝলমল।
কোন বিরিখের বোটা আমি, মা, কোন বিরিখের ফল।’
তখন মা, তাকে উত্তর দেন—
‘ওরে যাদুধন, চারি চকরি পুকুরখানি মধ্যে ঝলমল।
মন বিরিখের বোটা তুই তন বিরিখের ফল।’
আধ্যাত্মিক ধাঁধা অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং পরিবর্তনবিরোধী। সাধারণ মানুষের মধ্যে এজাতীয় ধাঁধা খুব বেশি প্রচলিত নয়। ‘চর্যাপদ’, ‘গোরক্ষবিজয়’-তেও এধরনের ধাঁধার প্রয়োগ দেখা যায়।
প্রশ্ন ৬ আচারমূলক ধাঁধা ও লৌকিক ধাঁধার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর আচারমূলক ধাঁধা: লোকজীবনে যেসকল অলৌকিক বা জাদু বিশ্বাস প্রচলিত ছিল, সেগুলিই পরবর্তীকালে বৈদিক যাগযজ্ঞাদিতে যুক্ত হয়ে আচারমূলক ধাঁধার সৃষ্টি করে। এই ধাঁধাগুলিও প্রশ্নমূলক। সামাজিক ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে আচারমূলক ধাঁধাগুলি জিজ্ঞাসা করা হত। রামকৃষ্ণ রায় রচিত ‘শিবায়ন’ কাব্যে শিবের বিবাহসভায় আটটি আচারমূলক ধাঁধার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।
একটি বিবাহাচারমূলক ধাঁধার দৃষ্টান্ত—
প্রশ্ন: ‘রাত্রির নিয়মে ভাই করলে কেন বেলা
কাজের সময়ে তোরা কর কেন হেলা’
উত্তর: কেউ বহিল দড়াদড়ি কেউ বহিল ভার
কেউ সাজল বড় লোক রাত অন্ধকার
ঠেস বড়ই গায়ে ভাই, হইল অনেক বেলা
পা জারিতে চাই ভাই আগুন কাঠ ভেলা।
আরও একটি দৃষ্টান্ত—
প্রশ্ন: ‘প্রভাতে আইলাম ভাই গঙ্গা নিবেদিত,
কেত কত বিপদে আছ কল হে সাক্ষাতে?’
উত্তর: কৃপা যদি করি মোরে করিলে জিজ্ঞাসা
লক্ষ টাকার কন্যা পায়ে মনের উল্লাস,
আর কত ধন দিবে অমূল্য রতন।
বড় সুখে আছি ভাই দশেরই চরণ।
লৌকিক ধাঁধা: লৌকিক ধাঁধা লোকজীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়। লোকজীবনের দৈনন্দিন, অতিপরিচিত বিষয়বস্তুই লৌকিক ধাঁধার মূল উপজীব্য। যেমন—‘বন থেকে বেরুল টিয়ে।
সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।’
উত্তর: আনারস।
লৌকিক ধাঁধার প্রকার: বিষয়ানুসারে লৌকিক ধাঁধাগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়—১. দেবদেবী বিষয়ক, ২. জীবজন্তু বিষয়ক, ৩. গাছপালা বিষয়ক, ৪. নরনারী বিষয়ক, ৫. বস্তু বিষয়ক, ৬. গ্রহ-নক্ষত্র বিষয়ক, ৭. কাজকর্ম বিষয়ক, ৮. ব্যক্তিসম্পর্ক বিষয়ক, ৯. সংখ্যা বিষয়ক, ১০. পৌরাণিক, ১১. বুদ্ধির পরীক্ষামূলক, ১২. কাহিনিমূলক প্রভৃতি।
প্রশ্ন ৭: লৌকিক ধাঁধার ভাগগুলির দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তর: দার্শনিক ইঙ্গিতবাহী: কখনো-কখনো ধাঁধা গভীর দার্শনিকতার ইঙ্গিত বহন করে। যেমন—‘উঠতে সূর্য নমস্কার / পড়তে সূর্য নমস্কার।’
উত্তর: কলার থোড়।
ব্যাখ্যা: কলার থোড়ের জন্ম, বৃদ্ধি, বংশবিস্তার সবটাই সূর্যের দিকে মুখ করে, তার মৃত্যু ও তেমনই সূর্যমুখী। এই ধাঁধাটি জীবনের সংক্ষিপ্ততা, অসারতা এবং মৃত্যুর অমোঘ বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে। ধাঁধার উত্তরটির চাইতেও ধাঁধাটির অন্তর্নিহিত দার্শনিক গূঢ়ার্থই এর মূল নির্যাস।
দেবদেবী বিষয়ক: লৌকিক এবং পৌরাণিক দেবদেবীদের নিয়ে ধাঁধা রচনার প্রবণতা ছিল প্রবল। এমনই একটি ধাঁধা হল—
‘এক যাত্রী তিনের গমন / ছয়পদ তার উনিশ নয়ন
দ্বিভুজ বাহু সাতটি মাথ / দেখলে সবাই করে প্রণিপাত।’
উত্তর: শিব, ষাঁড় ও সাপ।
ব্যাখ্যা: শিবের দুই পা আর ষাঁড়ের চার পা—মোট ছয় পা। শিবের অপর নাম পঞ্চানন, অর্থাৎ তাঁর পাঁচটি মাথা। সুতরাং ত্রিনয়ন যোগে শিবের পনেরোটি চোখ। ষাঁড় ও সাপের দুটি করে চারটি, মোট উনিশটি চোখ। শিবের দুটি বাহু। শিব, ষাঁড় ও সাপের একত্রে যাত্রা করার কথা বলা হয়েছে; তাই সকলে প্রণাম করছে।
মানুষ বিষয়ক: ‘এক হাত গাছটি / ডাল তায় পাঁচটি!’
উত্তর: মানুষের হাত ও আঙুল।
জীবজন্তু বিষয়ক: ‘জলেতে সর্বদা থাকে নহে জলচর
ভূমেতে ভ্রমণ করে নহে ভূমিচর
খেচরের শক্তি ধরে খেচর তো নয়
বল দেখি মহাশয় কোন প্রাণী হয়।’
উত্তর: হাঁস।
গাছপালাবিষয়ক: ‘লোট্ না লোটন লোটকুড়ি / মাঝে মধ্যে বন্ধ ঝুড়ি
কোন্ স্যাকরায় গড়েছে / মণিযুক্তেরে ভরেছে।’
উত্তর: ডালিম।
বস্তু বিষয়ক: ‘এক রাঁধুনি হরেক দেশে / সব রান্নাই রাঁধে সে।’
উত্তর: আগুন।
গ্রহনক্ষত্র বিষয়ক: ‘মামা ডাকে মামা বলে, বাবা বলে তাই
ছেলেতেও তাই ডাকে, তাই ডাকে মায়।’
উত্তর: চাঁদ / সূর্য।
কাজকর্ম বিষয়ক: ‘পাঁচজনে তোলে বত্রিশ জন ধরে
আর একজন ঠেলে দিলে সমুদ্রে পড়ে।’
উত্তর: আঙুল, দাঁত ও জিভের সাহায্যে খাওয়া।
ব্যক্তিসম্পর্ক বিষয়ক: ‘আমি তোর ভগ্নীপতির পত্নীর পিতা
আমি যে কে চিনলি না-কি তা?’
উত্তর: বাবা।
সংখ্যা বিষয়ক: ‘চন্দ্রে গ্রহে যুক্ত করি / তাহার অর্ধেক ধরি
গুণাগুণ শুন মন দিয়া / তত মুদ্রা দিবে পাঠাইয়া।’
উত্তর: ৩৫ টাকা।
ব্যাখ্যা: (চন্দ্র-১, গ্রহ-৯, অর্ণব/সমুদ্র-৭)। (১+৯=১০, ১০÷২=৫, ৫×৭=৩৫)
পৌরাণিক ধাঁধা: ‘স্ত্রী পুরুষে খায় পান
দুই জনার বাইশ কান।’—কারা?
উত্তর: রাবণ ও মন্দোদরী।
ব্যাখ্যা: রাবণ দশানন, তাঁর দশটি মাথায় মোট কুড়িটি কান এবং তাঁর স্ত্রী মন্দোদরীর দুটি কান অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর সর্বমোট বাইশটি কান। তাই রাবণ আর মন্দোদরীকেই বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন ৮: বাংলা ধাঁধার বিষয়বৈচিত্র্যটি কয়েকটি উদাহরণ দ্বারা চিহ্নিত করো।
উত্তর: ধাঁধার বিষয়বৈচিত্র্য: বাংলা ধাঁধায় মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বহু বিষয় অন্বিত। কারণ ধাঁধার উদ্ভব-বিকাশ-স্থিতি সবই লোকজীবনকে অবলম্বন করে।
ঘরগেরস্থালি, শিলনোড়া, হাতা-লাঠি-উনুন, ফুল-ফল, লতাপাতা, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি, মানবজীবনের আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ, সামাজিক-পারিবারিক সম্পর্ক—সবই ধাঁধার উপর ছায়া ফেলে। বাংলার একান্ত যে পরিমণ্ডল সেদিকে লক্ষ্য রেখে গ্রহ-নক্ষত্র, নরনারী, প্রাত্যহিক জীবনের তৈজসপত্র, প্রকৃতি, পশুপাখি, আচার-ব্যবহার, হিসাবনিকাশ ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক বিভাগগুলি উল্লেখযোগ্য।
উদাহরণ:
নরনারী ও দেবদেবী বিষয়ক: এই ধরনের ধাঁধা ও তার উত্তরে পূজ্য দেবদেবী ও মানুষগণের কথাই প্রাধান্য পেয়েছে—
‘সকাল বেলায় চারপায়ে হাঁটে
দুপুরবেলায় দুই পায়ে হাঁটে
বিকেলবেলায় তিন পায়ে হাঁটে
দেশে চলে বাবাজি।’
উত্তর:মানুষ – একটি মানুষের জীবনের কালপর্যায় এই ধাঁধায় অন্বিত।
পশুপাখি-কীটপতঙ্গ বিষয়ক: এমন ধাঁধায় মানুষের চারপাশের প্রায় সব পশুপাখি, কীটপতঙ্গের ছায়াপাত লক্ষ্য করা যায়—
‘হিড়িং বিড়িং তিড়িং ভাই
চোখ দুটো তার মাথা নাই।’
উত্তর:কাঁকড়া
গার্হস্থ্য জীবন বিষয়ক: মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ছুঁয়ে থাকা প্রায় সব কিছুই এমন ধাঁধায় অন্তর্গত।
‘ঘর আছে দরজা নাই
মানুষ আছে কথা নাই।’
উত্তর:ডিম
প্রশ্ন ৯: মানবজীবনে ধাঁধার গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: ধাঁধার গুরুত্ব: লোকসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য ধারা ধাঁধার গুরুত্ব মানবজীবনে অপরিসীম। ধাঁধার মধ্যে দিয়ে বুদ্ধির উৎকর্ষ যাচাই ও বুদ্ধির প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। প্রশ্নকর্তার সৃষ্টিশীলতা অত্যন্ত সহজ ও সংক্ষেপে উপস্থাপিত হওয়ায় তার সৃজনশীলতার প্রয়াস ক্রমাগত অব্যাহত থাকে। ধাঁধার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে আপাত অশ্লীলতা বাদ দিলে দেখা যায়, এগুলি বয়স-লিঙ্গ ও জাতি-ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সকলের অবসর বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। যেমন—দাদু ও নাতি বা নাতনি একে অপরের সঙ্গে ধাঁধাছাড়ায় সাবলীলভাবে মেতে উঠতে পারে। এর ফলে বয়স্ক মানুষটির বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা শিশুর জ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। অন্যদিকে, শিশুর আপাত সহজসরল ধাঁধাগুলি বৃদ্ধকে তার ছেলেবেলায় টেনে নিয়ে যায়। উত্তরদাতা ধাঁধার উত্তর দিতে পারলে বা না পারলে তাতে কোনো প্রতিযোগিতা, হিংসা বা দ্বেষ নয়; বরং মজার কোনো বিষয় শেখার আনন্দ তৈরি হয়। এ ছাড়া, ধাঁধার রচনা, চর্চা বা প্রয়োগের মাধ্যম দিয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, রোমান্টিক ভাবনা এবং সুচারু অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ও বাস্তববোধের বিকাশ ঘটে।
যেমন— “একটারে দিলাম টিপ/গুষ্টি শুদ্ধ বুঝি ঠিক।”
উত্তর: ভাত রাঁধা।
এই প্রকার ধাঁধা যেমন বুদ্ধি যাচাই করে এবং একই সঙ্গে হাস্যরসের উদ্রেক ঘোটায় ।
ধাঁধার প্রশ্ন: ‘শ্বশুরের পুত্র নয় স্বামী বল কার?
দশ হস্ত পঞ্চমুণ্ড পতি যে তাহার’—কার?
উত্তর: দ্রৌপদী।
এই পৌরাণিক ধাঁধাটি পুরাণ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। মজার ছলেই আমরা দ্রৌপদীর সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডবের বিবাহসম্বন্ধীয় তথ্যটি পেয়ে যাই।
অর্থাৎ ধাঁধা মানবজীবনকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করে তোলে।
প্রশ্ন ১০: ধাঁধা ও প্রবাদের সাদৃশ্যগুলি উল্লেখ করো।
উত্তর: বাংলা লোকসাহিত্যের দুটি বিশিষ্ট ধারা প্রবাদ এবং ধাঁধা। দুটি শৈলীরই প্রকৃতিগত, আঙ্গিকগত ও বিষয়গত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
সাদৃশ্য: ধাঁধা ও প্রবাদের সাদৃশ্য—
• ধাঁধা এবং প্রবাদ দুটি শৈলীই লৌকিক জীবনাশ্রিত উপাদানে সৃষ্ট।
• ধাঁধা এবং প্রবাদ লৌকিক পরম্পরায় বাহিত হয়।
• ধাঁধা এবং প্রবাদ উভয়ের প্রকাশলক্ষণ সংক্ষিপ্ত।
• ধাঁধা এবং প্রবাদ লোকজীবনের জীবন্ত উপাদানে রচিত হওয়ায় উভয়েরই সরলতা ও সহজতা লক্ষণীয়।
• ধাঁধা এবং প্রবাদ উভয়ই একটি বা দুটি বাক্যবিশিষ্ট হয়।
• ধাঁধা ও প্রবাদের কোনোটিরই রচয়িতার নাম জানা যায় না।
• ধাঁধা ও প্রবাদ উচ্চারণভেদে ও অঞ্চলভেদে রূপ পরিবর্তন করতে পারে।
• ধাঁধা এবং প্রবাদ উভয়ই অন্ত্যমিলযুক্ত পদ্য আকারে বা সরল বাক্য আকারে উপস্থাপিত হতে পারে।
একটি প্রবাদের উদাহরণ: ‘মেঘ না চাইতেই জল’।
একটি ধাঁধার উদাহরণ: ‘বন থেকে বেরুল টিয়ে।
সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।’ (আনারস)
প্রশ্ন ১১: ধাঁধা এবং প্রবাদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
উত্তর: ধাঁধা এবং প্রবাদের মধ্যে পার্থক্য: বাংলা লোকসাহিত্যে প্রবাদ ও ধাঁধা—দুটি বিশিষ্ট শৈলী। কিন্তু এদের মধ্যে কিছু অমিল বর্তমান। সেগুলি হলো
ধাঁধা প্রবাদ
(১) ধাঁধার অর্থ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিগ্ৰাহ্য। কারণ ধাঁধার উত্তর অনুক্ত থাকে, তা সমাধান করে বের করতে হয়। (১) প্রবাদ তুলনামূলকভাবে কম বুদ্ধিগ্ৰাহ্য। কারণ প্রবাদের মধ্যেই নীতির বক্তব্য অন্তর্নিহিত থাকে।
(২) ধাঁধা নিছকই লৌকিক স্তরে লোকচর্চার বিষয় হয়ে আছে। সাহিত্যিক ধাঁধা থাকলেও তার বৌদ্ধিক চর্চার স্তরে পৌঁছানোর দাবি কম। (২) প্রবাদে এক ধরনের গভীর মননশীলতার প্রক্ষেপ থাকে বলে তা লৌকিকতাকে অতিক্রম করে আধুনিক সাহিত্য স্তরেও গৃহীত হয়।
(৩) লোকতাত্ত্বিকদের ধারণানুযায়ী, ধাঁধা প্রবাদের থেকেও প্রাচীন। (৩) লোকতাত্ত্বিকদের মতে, প্রবাদের সৃষ্টি ধাঁধার পরে হলেও সমাজজীবনে প্রবাদের প্রচলন, প্রয়োগ ও সজীবতা অনেক বেশি।
(৪) ধাঁধা লৌকিক অবসর বিনোদনের ক্ষেত্রেই কেবল প্রযুক্ত হয় বলে, এর প্রাণময়তা প্রবাদের তুলনায় কম। (৪) প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে প্রবাদের সংযোগ প্রায়োগিক দিক থেকে প্রবল বলে তার প্রাণময়তা অধিকতর।
(৫) ধাঁধা নমনীয় ভাষা-ভাব ও স্নিগ্ধ কৌতুকবোধে সমাচ্ছন্ন। (৫) প্রবাদ গভীর জীবনদর্শনের ফসল, তাই এর ভাষা-ভাব ও প্রয়োগ তীক্ষ্ণ এবং প্রত্যক্ষ।
(৬) ধাঁধা কাব্য করে কৌতুক প্রদান করে। (৬) প্রবাদ পাণ্ডিত্যকে প্রকাশ করে।
________________________________________
প্রশ্ন ১২: ধাঁধায় বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর: ধাঁধায় বাঙালির গার্হস্থ্য জীবন: লোকসাহিত্যের অন্যতম শাখা ধাঁধায় গার্হস্থ্য-পারিবারিক জীবনের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে উঠে আসে। নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়, বস্তু, ব্যক্তি, ভাবনা ইত্যাদিই ধাঁধার মূল চালিকাশক্তি। একটু আলোচনা করলে দেখা যায়—
১. ধাঁধায় বাঙালির ঈশ্বর-আল্লা, উৎসব-অনুষ্ঠান, পূজাপার্বণ অনিবার্যভাবে উঠে আসে। যেমন—‘একটুখানি গাছে/কেষ্ট ঠাকুর নাচে।’ উত্তর: বেগুন। (বর্ণ সাদৃশ্য)
২. কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করে গার্হস্থ্য জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণকে বিশেষভাবে চিত্রিত করা হয়।
যেমন—‘মাটির নিচে থাকেন বুড়ি/কাপড় পরেন এক কুড়ি।
ধোপায় কাপড় কাচে না/তবু কাপড় ময়লা হয় না।’ উত্তর: রসুন।
৩. ধাঁধায় আপাতপরিচিত বিষয়গুলি কৌতুকময়তার সঙ্গে প্রকাশিত হয়। প্রশ্নকারে সহজ জিনিসকে বা গার্হস্থ্যের অতি প্রয়োজনীয় বিষয়কে ছন্দের ছলে উপস্থাপন করা হয়।
যেমন—‘হাত নাই পাই নাই দেশে দেশে ঘোরে
এর অভাব হলে লোকে অনাহারে মরে।’ উত্তর: টাকা।
৪. গার্হস্থ্য জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, সৃজনশীলতা সূক্ষ্ম প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয় ধাঁধার মধ্যে।
যেমন—‘লোহার ঘোড়া ল্যাজ লম্বে
দৌড়ালে পরেই ল্যাজ কমবে।’ উত্তর: ইঁট-সুতো।
প্রশ্ন ১৩: ধাঁধায় বাংলার কৃষি-প্রকৃতি-অনুষ্ঠানমূলকতা কীভাবে ছায়া ফেলেছে, তা দেখাও।
উত্তর: কৃষিতে ধাঁধা: ধাঁধার রচনাকারগণ বঙ্গজীবনের কত বিষয়কেই যে গভীর দর্শন ও গহন কৌতুকবহ সহজভাবে গ্রহণ করেছিলেন—ভাবলে অবাক হতে হয়। বঙ্গজীবনের আত্মার সঙ্গে বিজড়িত তার কৃষি, কারণ কৃষিকেই বাঙালি দেবমহিমার মর্যাদা দেয়। নিরবচ্ছিন্ন শ্রমের স্পর্শে কৃষি বাঙালিকে দেয় বাঁচার আহার। কৃষির অবলম্বন বাংলার চির-উর্বর মৃত্তিকার কথা তাই গভীর স্বীকৃতিতে ধরে রাখে ধাঁধা—
“আশ্চর্য এ জিনিস ভাই, নিতা গর্ভবতী
পতি ছাড়া হাজার সন্তান নিত্য পোয়াতি।” (মাটি)
প্রকৃতির সঙ্গে ধাঁধা: কৃষির সঙ্গে প্রকৃতির অনিবার্য যোগটি ধাঁধাকারদের দৃষ্টি এড়ায়নি। খরা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা-প্লাবন ইত্যাদির কথাকে বড়ো করে তোলে এমন ধাঁধার সংখ্যা কম নয়। যেমন—
“বেলে হাঁসে আণ্ডা পাড়ে
কে কতটি গুনতে পারে?” (তারা)
রাতের আকাশে আলোর মালা যে তারা, তা যেন এই ধাঁধায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানমূলকতায় ধাঁধা: বঙ্গজীবনের বারো মাসে তেরো পার্বণ। সুতরাং তার আচার-অনুষ্ঠান, পালাপার্বণের একান্ত গভীর প্রক্ষেপণকে অবলম্বন করে প্রচুর ধাঁধা হতে দেখা যায়। যেমন—গাজন, দুর্গাপূজা, নবান্ন, বিয়ে, পৌষপার্বণ ইত্যাদি। পৌষপার্বণকে অঙ্গের ধারণ করে শিল্পময় একটি ধাঁধা হলো—
“চার কোণার পুকুর মরা ডিঙি ভাসে
পার্শ্বে খোঁচা দিলে খিল খিলিয়া হাসে।”
প্রশ্ন ১৪: প্রচলিত একটি ধাঁধার সেকাল-একাল সম্পর্কিত ধারণা ব্যক্ত করো।
উত্তর: ধাঁধার সেকাল-একাল: ধাঁধা তার আপন উৎকর্ষে প্রাচীন কাল থেকে আজও স্বমহিমায় বিরাজমান। একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা হলো—গ্রিকপুরাণবৃত্তে রয়েছে, রাজা অয়দিপাউস ভয়ংকরী স্ফিংস (অর্ধনারী ও অর্ধসিংহী) রাক্ষসীর মুখোমুখি হলে সে রাজাকে একটি ধাঁধা শোনায়; যার উত্তর না দিতে পারলে অনিবার্য মৃত্যু। হেঁয়ালিটা ছিল—
‘কে ভোরে চতুষ্পদ, মধ্যাহ্নে দ্বিপদ ও অপরাহ্ণে ত্রিপদ?’
রাজা উত্তর দিয়েছিলেন ‘মানুষ’—সঠিক এই উত্তর শুনে স্ফিংস রাগে ফেটে পড়েছিলেন।
এই ধাঁধার অবিকল রূপ শোনা যায় বাংলার অজপাড়াগাঁয়ের নিরক্ষর বধূর মুখে:
‘সকাল বেলায় চার পায়ে হাঁটে
দুপুর বেলা দেয় দু-পায়ে হাঁটা
বিকেল বেলায় তিন পায়ে হেঁটে
দেশে ফেরে লোকটা।’
স্পষ্টতই শিশুকালে হামাগুড়ি, যৌবনে সটান দু-পায়ে হাঁটা এবং বৃদ্ধকালে লাঠিনর্ভর পদক্ষেপ এখানে প্রকাশিত।
এভাবেই লোকাচারের গণ্ডি অতিক্রম করে ধাঁধাগুলি প্রায়শ গোষ্ঠী বিনোদন বা Mass Entertainment হিসেবে গণ্য হয়। ধাঁধার মধ্যে এমন বহু প্রশ্ন করা হয় যেখানে ধর্ম সংক্রান্ত কোনো গূঢ়তত্ত্ব বা প্রথাগত কোনো ঐতিহ্য বহন নেই, নিছক আনন্দ দেওয়া ও পাওয়ার জন্যই এর ব্যবহার।
প্রশ্ন ১৫: ধাঁধায় রূপকের ভূমিকা সম্বন্ধে সংক্ষেপে একটি প্রবন্ধ লেখো।
উত্তর: ধাঁধায় রূপকসর্বস্ব: ধাঁধা মাত্রই রূপক বা Metaphor। এই রূপকের একদিকে রয়েছে উপমান, অন্যদিকে উপমেয়। একটি উপকরণ বা বিষয়ের মাধ্যমে অন্য একটি বিষয়কে লক্ষ বা নির্দেশ করাই হল ধাঁধার চিরাচরিত ধরন। ধাঁধায় তাই দুটি ভিন্ন বিষয় তথা রূপক বস্তু ও লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়—এই সাদৃশ্য হল Simile। ধাঁধার চতুর প্রশ্নগুলি রূপকের প্রয়োগ ঘটিয়ে, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে শ্রোতাকে লক্ষ্য বিষয়ের দিকে চালিত করে।
রূপক দ্বারা সৃষ্ট সংকেত: রূপকের প্রভাববশত ধাঁধার সঙ্গে উপমান-উপমেয়ের সমীকরণ গড়ে ওঠে। ফলত, উপমান-উপমেয় বা ধাঁধার প্রশ্ন ও উত্তরটি একে অপরের বিকল্প হয়ে ওঠে। ধাঁধার উপমান-উপমেয়ের এই সম্মিলিত প্রতীকটিকে Composite symbol বলা হয়।
রূপকের নেপথ্যে ট্যাবু (Taboo): স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজারের মতে, লোকজীবনে বহু শব্দ বা বিষয়ের নামোচ্চারণে নিষেধ তথা ‘ট্যাবু’ ছিল। ফলত, সেগুলিকে ঘুরিয়ে বলার পথ অবলম্বন করা হয়। এই Periphrasis রূপে ঘুরিয়ে বলা থেকেই ধাঁধায় অভীষ্ট বস্তুটিকে রূপক সংকেত এবং অন্যান্য আবরণে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করার প্রবণতা সুত্রপাত।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ‘চুন’ শব্দচ্চারণে Taboo থাকায় চুনকে ‘দই’ বলা হয়, সাপকে বলা হয় ‘লতা’, ‘বাঘ’-কে ‘বড় মিঞা’ ইত্যাদি। Periphrasis এবং Metaphor দ্বারা ঘুরিয়ে বলেই শ্রোতাকে লক্ষ্য উত্তরের দিকে পৌঁছে দেওয়া হয়। বুদ্ধির প্রয়োগে রূপকের বিশ্লেষণ করতে পারলেই পাওয়া যায় ধাঁধার সঠিক উত্তর। রূপকই ধাঁধায় প্রাণসঞ্চার করে থাকে।
প্রশ্ন ১৬: প্রাচীন কাল থেকে ধাঁধা কীভাবে প্রচলিত ছিল? অঞ্চলভেদে ধাঁধার উত্তরের ভিন্নতার দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তর: ধাঁধার প্রচলন: লোকসাহিত্যে ধাঁধার প্রচলন সেই প্রাচীন কাল থেকেই। এমনকি ঋগ্বেদ, ভারতীয় পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থেও ধাঁধার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রাচীন কাল থেকেই সাধারণ জনমানুষের শিক্ষার একটি অন্যতম লৌকিক উপায়। ধাঁধা জনসাধারণের মনে জীবন ও জগৎকে জানার কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। প্রাচীন সময়ে ধর্মীয় আচার, মৃত্যুকাল, কৃষিকাজ, অনাবৃষ্টি প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মের সময় ধাঁধার প্রচলন ছিল। আবার, বিবাহের অনুষ্ঠানে বর ও কন্যাপক্ষের মধ্যে ধাঁধার লড়াই ছিল একটি জনপ্রিয় প্রথা।
একই ধাঁধার বিভিন্ন উত্তর: আমাদের বহুপরিচিত একটি ধাঁধা হল—‘বন থেকে বেরল টিয়ে / সোনার টোপার মাথায় দিয়ে’—চব্বিশ পরগনা আর ঢাকা, চট্টগ্রামে এই ধাঁধাটির উত্তর ‘আনারস’; পাবনা, রাজশাহীতে ‘কলার থোড়’; বীরভূম, মুর্শিদাবাদে ‘পেঁয়াজ’ এবং টাঙ্গাইলে ‘লাঙলের ফল’। আবার, এই ধাঁধাটিই ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং আমেরিকার নানা অংশে ‘পাখি’, ‘শিকারি’, ‘সন্ন্যাসী’ ইত্যাদি উপমায় প্রচলিত। অঞ্চলভেদে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন জীবনযাত্রাই ধাঁধার উত্তরের ভিন্নতার কারণ।
প্রশ্ন ১৭: Decoding, Simile এবং Composite Symbol কী?
উত্তর: Decoding (ডি-কোডিং): ধাঁধার প্রশ্নে তার উত্তর সরাসরি বলে দেওয়া থাকে না—তা বুঝে নিতে হয়। তাই ধাঁধার ভাষা হল—Code language। তাই ধাঁধার প্রশ্নটি উত্তরদাতার সামনে রাখা হল—encoding আর সেই প্রশ্নকে ভেঙে তার রহস্য ভেদ করে উত্তরটি উদ্ঘাটন করা হল—decoding।
Simile (সাদৃশ্য বা অনুরূপতা): ধাঁধা প্রায়ই রূপক বা metaphor। অর্থাৎ উপমেয় এবং উপমান দ্বারা উত্তর ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়কে নির্দেশ করা হয়। সরাসরি কোনো বর্ণনা না দিয়ে পরোক্ষভাবে লক্ষ্যবস্তুর বিবরণ দেওয়া হয়। ধাঁধার লক্ষ্যবস্তু তথা উত্তরের সঙ্গে রূপক বিষয়টির যে অনুরূপতা বা সাদৃশ্য থাকার কারণে উত্তরদাতার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, সেই সাদৃশ্যকেই Simile বলে।
Composite Symbol (সংমিশ্রিত প্রতীক): ধাঁধার ক্ষেত্রে একটি লোকগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব এবং তার সাংস্কৃতিক রূপটি তাদের লোকজীবনের সবদিককে অবলম্বন করে ধরা দেয়। ফলত, ধাঁধার সঙ্গে উপমান-উপমেয়ের সমীকরণটি জুড়ে থাকে। একটি ধাঁধার প্রশ্ন এবং উত্তরটি পরস্পরের বিকল্প হয়ে ওঠে এবং দুটিতে মিলে একটি সংমিশ্রিত প্রতীকে পরিণত হয়। এই বিশুদ্ধ সংকেতটিকেই Composite Symbol বলা হয়ে থাকে।



